Friday, June 6, 2025

তারাদের কথা কী শুধুই মহাভারতের ধারাভাষ্য নাকি একটি Solo performance !

Gender নাকি sex ? এই দুটি শব্দের ছোঁয়াছুঁয়ি মেটাতে গিয়ে জবা শর্মার নির্দেশিত নাটকতারাদের কথাকোথাও হয়তো নিজেরই বাঁধা চোখে পট্টির ফাঁস খুঁজে না পেয়ে একটু দিক ভ্রষ্ট। নাটক শুরু হয় অন্তরঙ্গ পরিসরে সরাসরিই দর্শকের সাথে আলাপচারিতায়। তারপর নাটক জবা শর্মার একক অভিনয়ে ভর করে এগোতে থাকে। প্রথমে তিনি দৈনন্দিন যাপন থেকে উঠে আসা কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন কেন থার্ড জেন্ডারদের আলাদা বাথরুম থাকবে না? আর এখানেই ঘটে বিপর্যয়, অভিনেতা হিসেবে উনিও গুলিয়ে ফেলেন সেক্স এবং জেন্ডারে। উনি নাটকের ছত্রে ছত্রে জেন্ডার ডিসক্রিমিনেশন নিয়ে বলে  গেলেও তার উৎস বলতে গিয়ে বলেনবাবা মায়ের গন্ডগোল

সেক্স হল জৈবিক, পুরুষ, মহিলা এবং ইন্টারসেক্স যার ক্রোমোজোম বিন্যাস যথাক্রমে, XY, XX এবং XXY কিন্তু জেন্ডার অনেক বেশি সমাজিক যার ইংরেজি তর্জমা সোশ্যালি ইমপোস্।

ট্রান্সজেন্ডাদের প্রাসঙ্গিকতা আঙুল দিয়ে দেখাতে গিয়ে জবা শর্মা কোথাও যেন  LGBTQ+ কম্যুনিটির অনেক ধারনার স্পষ্টতা এড়িয়ে গেলেন….

ট্রান্সজেন্ডার নিয়ে কথা হবে আর মহাভারত আসবে না এটা কি ভাবে সম্ভব! উনিও তাই মহাভারত পাড়া থেকে ঘুরে এলেন, উঠে এলো শিখণ্ডীর কথা। কিন্তু উনি বাকি সবার মতো দাড়ি গোঁফ আছে,একটু নরম গলা আর সাজতে ভালোবাসে মানেই যে হাততালি দেবে এখানেই আটকে থেকে গেলেন। তালি বৃত্তি হল একটা পেশা যাকে আমরা হিজড়া বলি, কিন্তু সব ট্রান্সজেন্ডার হিজড়া নন, পুরো নাটকের জবা শর্মা এই সুক্ষ্ম পার্থক্যের কথা কোথাও উল্লেখ করেন না।

যেহেতু উনি একক অভিনয় করেন, তাই নাটকে আলো বা আবহের ঘনঘটা দেখা যায় না, তবে একক অভিনয়ের ক্ষেত্রে সংলাপে যতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, সামান্য মনোযোগের অভাবে ততটাই ঝুলিয়ে দিতে পারে অধিক পরিমাণে কথা.. পুরো নাটকে অনর্গল সংলাপের আধিক্য আর তাকে সংলাপ রাখেনি বরং কথা নির্ভর করে তুলেছিল। নাটকের ওজন কমে যেতে থাকে ক্রমাগত এখানেই।

জবা শর্মা নাটকে নিজের ছেলে তারিণীর কথা দিয়ে নাটক সাজিয়েছেন, “তারাদের কথাএখানে ব্যক্তি থেকে সমষ্টির দিকে আগাল কিন্তু সমষ্টির বল কখন ফসকে গড়িয়ে মাস বা ভিড় হয়ে গেল উনি নিজেও হয়তো সেই সুতোটাই টান দিয়ে রাখতে পারলেন না, বলা ভাল টের পেলেন না!

এবার আসা যাক solo acting and performance নিয়ে সমালোচনায়, পারফরমেন্স অনেক বেশি ফিজিক্যাল, আলো আবহ কেন্দ্রীক কিন্তু সোলো আক্টিং এর ক্ষেত্রে সংলাপ বা স্বরের পরিবর্তন দিয়ে খালি চরিত্রের পৃথকীকরণে বেশি জোর দিতে গিয়ে ভীষ্ম, শিখণ্ডী, অম্বা অম্বিকা, অম্বালিকা  এদের চরিত্রের একে অপরের সঙ্গে যে দ্বন্দ্ব বা তাদের ইনার ক্রাইসিস উপেক্ষিত। তাই দিনের শেষে এটা একটা সোলো পারফরমেন্স হিসেবে আটকে থেকে যায়..

অন্তরঙ্গ স্পেসে ঘুরে ঘুরে অনেক কথা, কিছু ঘটনা প্রবাহের ক্রনোলজি আর কিছু আর্গুমেন্ট একটা সময় পর পারফরমেন্সটাকে একঘেঁয়ে করে তোলে, কারণ যে দর্শক মহাভারত জানবেন তিনি তো আবার করে ঘটনা প্রবাহের ধারাপাত শুনতে আসবেন না সেখানে দাবী রাখবে দক্ষ অভিনয় শৈলী আর কিছু থিয়েট্রিকাল এলিমেন্ট, যা ফিরতি পথে হবে দর্শকের পুঁজি।



---------শুভব্রত আচার্য্য


Tuesday, June 3, 2025

‘থিয়েটার স্কোপ ভলিউম ৩’ এর সূচনা

গত ৩১ মে ২০২৫ দমদম সবুজ প্র্যাকটিস স্টুডিওতে শুভ উদ্বোধন হয়ে গেল সবুজ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের চারমাস ব্যাপী নাট্যোৎসব 'থিয়েটার স্কোপ ভলিউম ' এর। এই নাট্যোৎসব শুরু হয় ২০২০ সালে প্রথম।

ভলিউম অনুষ্ঠিত হয় মাসের নাট্যোৎসব কলকাতা মুক্তাঙ্গন রঙ্গালয়ে এবং ভলিউম অনুষ্ঠিত হয় নাগেরবাজার থিয়েএ্যপেক্স- , মাস ব্যাপী নাট্যোৎসব হয় সেটি। এইবার দমদম শুরু হয়, প্রতি মাসের শেষ শনিবার রবিবার এই উৎসব হবে। মোট ১৬ টি নাটক অভিনয় হবে। নাট্যোৎসবের উদ্বোধন করেন নাট্য সমালোচক শ্রী আশিস গোস্বামী এবং প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা তথ্য সংস্কৃতি দপ্তরের ডেপুটি ডিরেক্টর শ্রী পল্লব পাল নাট্য নির্দেশক, বিসমিল্লাহ খাঁ পুরষ্কারে পুরষ্কৃত শ্রী শুভজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। উক্ত দিন নাট্য নির্দেশক-অভিনেতা শ্রী শরণ্য দে, দীপ চক্রবর্তী, রাহুল বোস, অপূর্ব ঘোষ উপস্থিত ছিলেন এবং নাট্যোৎসব নিয়ে নিজেদের মতামত রাখেন।

নাটকের প্রয়োজনে বিভিন্ন ছোট ছোট স্পেস তৈরী হওয়া এবং থিয়েটারের মানুষদের সেখানে গিয়ে থিয়েটারকে উদযাপন করার কথা বলেন উদ্বোধক শ্রী আশিস গোস্বামী। সবুজের সাথে সম্পর্ক এমন নাট্যোৎসবের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলেন শ্রী শুভজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শ্রী পল্লব পাল। সবুজ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র তাদের বার্ষিক নাট্যোৎসবের পাশাপাশি এই নাট্যোৎসবটিও করে চলেছে ভবিষ্যতেও করবে এমন বার্তাই রাখেন শ্রী রাজেশ দেবনাথ। প্রথম পর্যায় সবুজ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, থিয়েমেকার্স, ইচ্ছেডানা এবং বোস ক্রিয়েটিভ এ্যান্ড পার্ফমিং আর্টস তাদের নাটক অভিনয় করেন। মে, জুন, জুলাই, আগষ্ট এই চার মাস শেষ শনিবার রবিবার নাটক অভিনয় হবে। কলকাতা তথা দমদমের নাট্যমোদীদের কাছে এটি আনন্দ সংবাদ। দর্শকপূর্ণ আবহাওয়া শুরু হলো 'থিয়েটার স্কোপ ভলিউম ৩’।

Thursday, May 22, 2025

থিয়েমেকার্সের নাটক : ভীম বধ

 

থিয়েমেকার্সের নাটক ভীম বধ পরবর্তী অভিনয় ১লা জুন ২০২৫, দমদম সবুজ প্র্যাকটিস স্টুডিওতে 'থিয়েটার স্কোপ ভলিউম ৩' নাট্যোৎসবের দ্বিতীয় দিন।

নাটক শুরু হয় নাট্য প্রস্তুতির এক বিশৃঙ্খল  পরিবেশে। পরিচালককালুদাএবং তার নাট্যদলের ছেলেরা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ নিয়ে একটি নাটক মঞ্চস্থ করতে চাইছে। কিন্তু এই মহড়ার মঞ্চে প্রবেশ করেই শুরু হয় এক অদ্ভুত বিশৃঙ্খলা যুক্তিবিদ্যার ধাঁধা।

হারাধনঅ্যাবস্ট্রাক্ট জঙ্গল তৈরি করেছে, ‘নিমাইভীম হয়ে দাড়ি নিয়ে হাজির হয়েছে, ‘নিখিলশ্রীকৃষ্ণের হাতে শঙ্খ চক্রর বদলে বাঁশি সাইকেলের চাকা নিয়ে এসেছে, আর দুর্যোধনের চরিত্রে থাকাপান্নালালনিজেকে ভীমের হাতে পরাজিত হতে দিতে নারাজ। তারা সকলেই বাস্তবতা, কল্পনা, দর্শন, থিয়েটার যুক্তি নিয়ে নিজেদের মতো মত প্রকাশ করে, এবং পুরো নাটকজুড়ে থিয়েটারের ভিতরের দ্বন্দ্ব বিভ্রান্তির রূপক ছড়িয়ে পড়ে।


অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে ভীম আর দুর্যোধন চরিত্রধারীরা সত্যি সত্যিই মারামারি জড়িয়ে পড়ে। দুর্যোধন চরিত্রে পান্নালাল সত্যিকারের গদা নিয়ে ভীম (নিমাই)-কে আঘাত করে, কৃষ্ণ চরিত্রধারীকেও আক্রমণ করে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে নাটকের ভেতরের নাটকই যেন মঞ্চে বাস্তব হয়ে ওঠে।

শেষ দৃশ্যে, কালুদা বাকিরা পান্নালালকে (দুর্যোধন) ধরে ফেলে, এবং নাটকের বাইরে এসে শিল্পের ভণ্ডামি নিয়ে মুখোমুখি প্রশ্ন তোলে পান্নালাল, চিৎকার করে বলে—" থিয়েটারের নামে যে জালিয়াতি করছো, পারবে সেটা বলতেশেষ দৃশ্যে, কালুদা বাকিরা পান্নালালকে (দুর্যোধন) ধরে ফেলে, এবং নাটকের বাইরে এসে শিল্পের ভণ্ডামি নিয়ে মুখোমুখি প্রশ্ন তোলে পান্নালাল, চিৎকার করে বলে—" থিয়েটারের নামে যে জালিয়াতি করছো, পারবে সেটা বলতে? মানুষের জীবনের কথা বলতে পারবে থিয়েটার?” কালুদা হঠাৎ বলে ওঠেনহত্যা করো ভীম, সত্য বলছে ও।এবং এই আত্মবিরোধিতার মাধ্যমে নাটক শেষ হয়

নাটক: নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়

নির্দেশনা, আলো, আবহ, মঞ্চ সম্পাদনা : সৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়

অভিনয় - অনিরুদ্ধ বিশ্বাস, মুশফিক আকন্দ, দেবদাস চক্রবর্তী , সৌম্য কর্মকার, আশীষ ঢোলাকিয়া

আবহ প্রক্ষেপন: সৌমিক নন্দী , আলোক প্রক্ষেপন: সৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রযোজনা নিয়ন্ত্রণ : অপূর্ব


Monday, May 19, 2025

রাতের বৃষ্টি ভীষণ ভয়ানক, যদি তা ঝরে সারারাত্তির


আমরা কি তিমিরবিলাসী?/আমরা তো তিমিরবিনাসী জীবনানন্দের এই লাইনদুটি নিয়েই বাড়ি ফিরতে বাধ্য হলাম, কলকাতা এস টি সি -এস নতুন প্রযোজনা সারারাত্তির দেখে। বাদল সরকারের জন্মদিন উদযাপন হেতু রাজেশ দেবনাথের নির্দেশনায় এই নাট্যের প্রথমেই যা আকর্ষণ করে তা হল এর দর্শক আসন। ওঁনাকে মাথায় রেখেই অন্তরঙ্গ প্রেক্ষাগৃহের চারিদিক ঘিরে দর্শক আর মধ্যেখানে সারারাত্তির। একটা চাপা অথচ ছেঁড়া ছেঁড়া অন্ধকার দিয়ে নাটকটি শুরু হয়, সৌভিক মোদকের আলো তাতে খানিকটা রহস্যের আবেগ বুনতে সাহায্য করে। নাটক যত বাড়তে থাকে একবিংশ শতাব্দীর সম্পর্কের অস্তিত্বসংকট ততই প্রগাঢ় হতে থাকে নবমিতা ঘোষ, তমান মুখার্জী অদ্রীশ কুমার রায়ের অভিনয়ে। আদ্রীশবাবুর চরিত্রের গভীর কাব্যময় ধোঁয়াশা তার সংলাপের তুলনায় আলো দিয়েই বেশী ফুটিয়ে তুলেছেন রাজেশ দেবনাথ।

বাদল সরকারের এই নাটকে দার্শনিকতার ব্যবহার বেশী কিন্ত নবমিতার প্রতিটা সংলাপ তার বিপন্নতা আমাকে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের, “ কিন্তু তুমি নেই বাহিরে, অন্তরে মেঘ করে ভারি ব্যাপক বৃষ্টি আমার বুকের মধ্যে ঝরেমনে করায়। সে যেন বারংবার তার স্বামীকে অস্ফুটে বোঝাতে চাই, “বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস আদ্রীশবাবু তার টের পেয়ে খানিকটা উত্তর দিয়ে যেতে থাকেন সারা নাট্য জুড়ে, “দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া এখানে পাড়া আর পাড়া থাকে না সমস্ত অবুঝ এবং আত্ম শ্লাঘায় ভরপুর স্বামীদের যেন ঠেস দেয়। নবমিতার ভেতরের জমাট অন্ধকার যত ঘনিয়ে ওঠে তত এই নাট্যে পারমিতা ঘোষের আবহের নিপুন প্রয়োগ দেখা যায় সারারাত্তির শব্দের প্রতিধ্বনি ঘটিয়ে।

আমরা চমকে উঠি, এ যেন সরাসরি আমাদের ভেতরের অন্ধকারকে ধাক্কা দিয়ে বলে যায়, ভাঙো। নাটকের ক্লাইমাক্স এ আমারা বুঝতে পারি প্রত্যেক নারী সারাজীবন হাতড়ে চলে আনন্দ, কিন্তু দাম্পত্যে শান্তি আর আনন্দ একসাথে বসবাস করতে পারে না।


তমাল বাবু নিজের অবস্থানে থেকে বাচিকের সরু সুতোর উপর চরিত্রের মন ও বিপন্নতার ভারসাম্য বজায় রেখে গেছেন। সারা নাট্যময় নবমিতার চরিত্র যেভাবে রঞ্জনকে খোঁজে তাতে আমরা বুঝতে পারি রঞ্জন একটা ভোর, যে সমস্ত অন্ধকার ছেনি হাতুড়ি দিয়ে কেটে কেটে বুকের ভেতর রোদের ভাস্কর্য ফুটিয়ে তুলবে। তাই ত নবমিতা রোজ রাতে বিনিদ্র থেকে জানলায় রঞ্জনের অপেক্ষা করে হয় ত। সে যখন একবার রঞ্জন বলে আকুতি জানায় গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। তবে নাটকের মঞ্চসজ্জা যেন আরো কিছুর দাবী জানাচ্ছিল। 

নাটকের মাঝে মাঝে এবং শেষে আবহে, শ্বাসের ওঠা নামা দিয়ে নির্দেশক যেন সারারাত্তির জুড়ে আমাদের ভেতরের অন্ধকারের অস্বস্তিকেই কিছুটা আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দেন। সব শেষে প্রবুদ্ধসুন্দর করের কবিতা “ এ শহরে পানশালা নেই তবুও রোজ বাড়ি ফেরে রাত্রির মাতাল এর মত করে বলতে ইচ্ছে করে এ শহরে হয় ত এখন বাদল সরকার নেই তবুও বাদলা করে আসে আর বৃষ্টি হয় সারারাত্তির, সারারাত্তির...

                                                                                                                                       
______________শুভব্রত আচার্য্য



তারাদের কথা কী শুধুই মহাভারতের ধারাভাষ্য নাকি একটি Solo performance !

Gender নাকি sex ? এই দুটি শব্দের ছোঁয়াছুঁয়ি মেটাতে গিয়ে জবা শর্মার নির্দেশিত নাটক ‘ তারাদের কথা ’ কোথাও হয়তো নিজেরই বাঁধ...